যে কারণে মানুষের কাছে জান্নাত ও জাহান্নাম দৃশ্যমান নয়

প্রকাশিত: ১০:৩৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৫, ২০২৩
প্রতীকী ছবি
 নিজস্ব প্রতিবেদক

পরকালীন বিচার ও জান্নাত-জাহান্নামের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা ইসলামী বিশ্বাসের অপরিহার্য অংশ। প্রত্যেক মুমিন বিশ্বাস করে, আল্লাহ পুরস্কার হিসেবে জান্নাত এবং শাস্তি হিসেবে জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। অদৃশ্যের জগতে জান্নাত ও জাহান্নাম বিদ্যমান। কিন্তু প্রশ্ন হলো আল্লাহ জান্নাত ও জাহান্নাম দৃশ্যমান করেন কেন? কেন তা মানুষের দৃষ্টি ও অনুভবের বাইরে রাখা হয়েছে? নিম্নে এর উত্তর দেওয়া হলো :

দৃশ্যমান না হওয়ার কারণ

কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জান্নাত ও জাহান্নাম দৃশ্যমান না হওয়ার কয়েকটি কারণ হলো :

১. পরীক্ষার জন্য : আল্লাহ তাআলার পৃথিবী মানবজাতির জন্য পরীক্ষার স্থান।

আল্লাহ পার্থিব জীবনে মানুষকে নানাভাবে পরীক্ষা করেন। এর একটি মাধ্যম হলো অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস। যারা না দেখে অদৃশ্যের বিষয়গুলো সম্পর্কে আল্লাহর কথার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, আল্লাহ তাদের পুরস্কৃত করবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(তারাই সফল) যারা অদৃশ্যে ঈমান আনে, নামাজ আদায় করে এবং তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৩)
 

জান্নাত ও জাহান্নাম দৃশ্যমান হলে তা মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ হতো না।

২. অদৃশ্য জগতের অংশ : আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো, জান্নাত ও জাহান্নাম বিদ্যমান। আল্লাহ তা সৃষ্টি করে রেখেছেন এবং তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন। তা এখন অদৃশ্যের জগতে রয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা দৃশ্যমান করবেন।

আর অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘অদৃশ্যের চাবি তাঁর কাছেই আছে। তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। জলে ও স্থলে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত, তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না বা রসযুক্ত বা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫৯) 

৩. অদৃশ্যের বিশ্বাসই ঈমান : কেননা না দেখে বিশ্বাস স্থাপনই প্রকৃত ঈমান।

এ জন্য মৃত্যুর সময় যখন মানুষের সামনে তাঁর পরিণতি প্রকাশ পায় অথবা যখন কিয়ামতের বড় বড় নিদর্শন প্রকাশ পাবে, তখন মানুষের ঈমান আর গ্রহণযোগ্য হবে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যেদিন তোমার প্রতিপালকের কোনো নিদর্শন আসবে, সেদিন তার ঈমান কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি আগে ঈমান আনেনি বা যে ব্যক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করেনি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫৮) 

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তাওবা করছি এবং তাদের জন্যও নয়, যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৮)

৪. সহ্য ক্ষমতার বাইরে : আল্লাহ জান্নাত ও জাহান্নামকে দৃশ্যমান না করার আরেকটি কারণ হলো, মানুষ জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না, বিশেষত জাহান্নামের শাস্তি। পাপী ব্যক্তির মৃত্যুর সময় তার সামনে জাহান্নাম দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং তাতে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘কখনো নয়, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে এবং বলা হবে, কে তাকে রক্ষা করবে? তখন তার প্রত্যয় হবে যে এটা বিদায়ক্ষণ এবং পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। সেদিন তোমার প্রভুর কাছে সব কিছু প্রত্যানীত হবে।’ (সুরা : কিয়ামা, আয়াত : ২৬-৩০)

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেন, আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন সব বস্তু তৈরি করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো ব্যক্তির মন কল্পনা করেনি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭৮০)

হাদিসবিশারদরা বলেন, মানুষ কল্পনা করেনি–বাক্যের অর্থ হলো এগুলো মানুষের ইন্দ্রীয় শক্তি ও কল্পনা শক্তির ঊর্ধ্বে।

দেখার পর ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। যখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে, আর লোকজন তা দেখবে, তখন সবাই ঈমান আনবে। কিন্তু তাদের ঈমান গ্রহণ করা হবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০৫)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার পর মানুষের ঈমান কোনো উপকারে আসবে না। কেননা তখন মানুষের অন্তর ভয়ে পূর্ণ হয়ে যাবে, সব প্রবৃত্তি মিটে যাবে, শরীরের সব শক্তি লোপ পাবে অর্থাৎ সে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। অনিচ্ছায় আল্লাহর কালামের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ৭/১৪৬)

অনুরূপ জান্নাত ও জাহান্নাম দৃশ্যমান হলে মানুষ নিজের অনিচ্ছায় ঈমান নিয়ে আসত। তা পরীক্ষার মাধ্যম থাকত না। শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহ.) বলেন, ‘দৃশ্যমান অনুভূত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকে ঈমান বলে না। কেননা তা অস্বীকার করার সুযোগ থাকে না।’ (তাফসিরে উসাইমিন : ১/৩২)

পৃথিবীতে উপমা রেখেছেন

আল্লাহ জান্নাত ও জাহান্নামকে দৃশ্যমান করেননি, তবে দুটি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায় এমন বহু বিষয় পৃথিবীতে রেখেছেন। যেমন- জান্নাতের সদৃশ সবুজ বন, বাগান, পাখি, নদী ও ঝরনা সৃষ্টি করেছেন, একইভাবে জাহান্নামের সদৃশ আগুন, আগ্নেয়গিরি, ধারালো অস্ত্র ও কারাগার তৈরি করেছেন। মহান আল্লাহ জান্নাতের বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘মুত্তাকিদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত : তাতে আছে নির্মল পানির নহর, আছে দুধের নহর, যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহর, আছে পরিশোধিত মধুর নহর এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল এবং তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা।’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ১৫)

জাহান্নাম সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আমার আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে আগুনে দগ্ধ করবই; তখনই তার স্থানে নতুন চামড়া সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৬)

আল্লাহ সবাইকে জান্নাত উপার্জনের তাওফিক দিন। আমিন।